| বঙ্গাব্দ

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ফেরিওয়ালাকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা | বাংলাদেশ প্রতিদিন

রিপোর্টারের নামঃ BDS Bulbul Ahmed
  • আপডেট টাইম : 13-06-2026 ইং
  • 9649 বার পঠিত
পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ফেরিওয়ালাকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা | বাংলাদেশ প্রতিদিন
ছবির ক্যাপশন: পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ফেরিওয়ালাকে হত্যা

পুরুলিয়ায় বাড়ি ডেকে নিয়ে ফেরিওয়ালা আকবরকে নৃশংস খুন: ‘বিজেপি আসার পর থেকেই আতঙ্কে আছি’, দাবি নিহতের ছেলের

উপমহাদেশ ডেস্ক | বাংলাদেশ প্রতিদিন

প্রকাশিত: ১৩ জুন, ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায় আকবর মণ্ডল (৪৭) নামে এক মুসলিম ফেরিওয়ালাকে কুড়াল দিয়ে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও ছুরি মেরে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের জেরে রাজ্যে ছড়িয়ে পড়া তীব্র মুসলিমবিরোধী ভীতি ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কারণেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। তবে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত এই ঘটনার পেছনে কোনো ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ভারতের প্রভাবশালী ও অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’ (The Wire)-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ জুন পুরুলিয়ার বান্দওয়ান এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে।

বাড়ি ডেকে নিয়ে কুড়াল-ছুরি দিয়ে নৃসংশ হামলা

নিহত আকবর মণ্ডলের বাড়ি বীরভূমের পুনিসলে গ্রামে। গত ১০ জুন তাঁর মরদেহ নিজ গ্রামে নিয়ে যাওয়ার সময় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন আকবরের ২০ বছর বয়সি ছেলে জুলফিকার মণ্ডল। দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে জুলফিকারও বাবার মতো পুরুলিয়ার বান্দওয়ান এলাকাতেই ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

বাবার মৃত্যুর বর্ণনা দিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে জুলফিকার বলেন, “গত ৯ জুন সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে আমার বাবা স্টিলের বাসনপত্র নিয়ে সুপুরিধি গ্রামের একটি রাস্তায় ফেরি করছিলেন। এ সময় ওই গ্রামের একটি বাড়ি থেকে বাবাকে জোর করে ডেকে ভেতরে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিশ্বনাথ মাহাতো নামের এক ব্যক্তি প্রথমে লাঠি দিয়ে বাবাকে বেদম মারধর করে। বাবা আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে পাশ থেকে কুড়াল এনে মাথায় ও শরীরে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। এরপর বাবাকে ছুরিও মারা হয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।”

দুপুরের দিকে বান্দওয়ান থানার পুলিশ ফোন করে জুলফিকারকে হাসপাতালে ডাকলে তিনি গিয়ে বাবার রক্তাক্ত ও মাথা ফাটা মরদেহ দেখতে পান। চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে আনার অনেক আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আকবরের মৃত্যু হয়েছিল।

‘দাড়ি থাকার কারণে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করা হতো’

নিহতের ছেলে জুলফিকারের অভিযোগ, এলাকাটিতে গত কিছুদিন ধরে গেরুয়া শিবিরের রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ার পর থেকেই মুসলিমদের টার্গেট করা হচ্ছিল। তিনি বলেন, “আমাদের দাড়ি থাকার কারণে প্রায় সময় রাস্তায় জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করা হতো। আমাদের হুমকি দিয়ে বলা হতো, এখানে আর ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করতে দেওয়া হবে না। বিজেপি সরকার (কেন্দ্রে ও রাজনৈতিক প্রভাবে) আসার পর থেকেই এখানে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমরা সবসময় এক বুক আতঙ্ক নিয়ে কাজ করতাম। এই ভীতি ও বিদ্বেষের রাজনীতির কারণেই আমার বাবাকে মরতে হলো।”

আকবরের স্ত্রী নাজিমা বিবি এবং মেয়ে জাম্মাতুন খাতুন জানান, আকবর দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে একই এলাকায় ফেরি করতেন, ফলে স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম সবার কাছেই তিনি অত্যন্ত পরিচিত ও ভদ্র মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জুলফিকারের প্রশ্ন, “বাবা নিশ্চয়ই ওই বাড়ির ভেতর থেকে বাঁচানোর জন্য চিৎকার করেছিলেন, কিন্তু গ্রামবাসী বা প্রতিবেশীদের কেউ এগিয়ে এলো না কেন?”

একই গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা খেলাপত হোসেন মণ্ডল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের গ্রামের মানুষ বছরের পর বছর ওই এলাকায় ফেরি করে আসছে। আগে কখনও কোনো হিন্দু ভাই আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি। কিন্তু রাজ্যে ইদানীং বিজেপি তথা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি জাঁকিয়ে বসার পর মুসলমানদের ওপর হামলার প্রবণতা বাড়ছে। আমরা এখন পেটের তাগিদে কাজের জন্য বের হলেও বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা পাই না।”

পুলিশের দাবি: ব্যক্তিগত বিবাদ হতে পারে

এদিকে পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার (SP) ভৈভব তিওয়ারি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত মূল অভিযুক্ত বিশ্বনাথ মাহাতোকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডটি অভিযুক্ত মাহাতোর বাড়ির ভেতরেই ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।

তবে ঘটনার পেছনে সাম্প্রদায়িক কোনো কারণ রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার বলেন, “ঠিক কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি কোনো ব্যক্তিগত বিবাদ বা আকস্মিক ঝগড়ার ফলও হতে পারে। আমাদের প্রাথমিক তদন্তে বর্তমানে এর পেছনে কোনো ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের মোটিভ বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আগেও ঘটেছে ছুরিকাঘাতের ঘটনা, আতঙ্কে ঘরে ফিরছেন ফেরিওয়ালারা

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, পুলিশের দাবি খোদ বাস্তবের সাথে মিলছে না। কারণ মাত্র কয়েক মাস আগেই একই গ্রামের আরেক মুসলিম ফেরিওয়ালাকে বাঁকুড়া শহরের কাঁকাটা এলাকায় ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে অস্বীকার করায় প্রকাশ্য রাস্তায় ছুরিকাঘাত করা হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার মুসলিম ফেরিওয়ালাদের মনে তীব্র ভীতি তৈরি হয়েছিল, আর আকবরের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সেই আতঙ্ককে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

নিহত আকবরের বড় ভাই ও মুরগি বিক্রেতা নূর মোহাম্মদ মণ্ডল বলেন, “এখন ভারতে মুসলমানরা সবচেয়ে সহজ লক্ষ্যবস্তু (Soft Target) হয়ে গেছে। পুরুলিয়ায় কাজ করা আমাদের গ্রামের অনেক ফেরিওয়ালা এখন ভয়ে ও আতঙ্কে ব্যবসা বন্ধ করে বীরভূমে ফিরে আসছেন। কিন্তু এই ছোট গ্রামে তো কোনো কাজ নেই। কাজ না করলে পরিবার না খেয়ে মরবে, আর কাজ করতে বাইরে গেলে কুড়ালের কোপ খেতে হবে! আমরা এখন বাঁচব কীভাবে?” আকবরের এই অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে এবং দারিদ্র্যের কারণে তাঁর মেয়ে জাম্মাতুনের একাদশ শ্রেণির পর পড়াশোনাও চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
ফেসবুকে আমরা...
নামাজের সময়সূচী
জাতীয় সঙ্গীত
©সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন সত্যের সন্ধানে সব সময় | আমাদের সাইটের কোন বিষয়বস্তু অনুমতি ছাড়া কপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ
সকল কারিগরী সহযোগিতায় BDS Digital Marketing Agency